অণুগল্প: হোম
মিলি মাঝে মাঝে ভাবে, এটাকে হোম কেন বলে। হোম মানে তো বাড়ি। এই জায়গাটার সাথে বাড়ির কোনই মিল নেই। বরং জেলখানার সাথে বেশি মিল। অবশ্য এই জেলখানা থেকে খুব শিগগিরই সে মুক্তি পাবে। মিলি এমনিতে খুব শক্ত মনের মেয়ে। গত তিন মাসে ওর জীবনে যে ঝড় বয়ে গেছে তাতে যে কোনো মেয়েই ভেঙে পড়তো। মাঝে মাঝে যে গলার কাছটা দলা পাকিয়ে ওঠেনা তা নয়। তখন মিলি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে আর ঢোক গিলে গিলে কান্নাটাকে গিলে ফেলে।
জেলায় যেসব মেয়ে বিয়ে রুখে দিয়ে খবর হয় মিলি ঠিক তাদের মতন নয়। ওর মা ঠিকই বলে। খবর হওয়া মানে বদনাম হওয়া। ওদের গ্রামের সন্ধ্যারানী বিয়ে রুখে খবর হয়েছিল, সে আজও বাপের ঘরে। যে মেয়ে বাপ মায়ের বিরুদ্ধে পুলিশে যায়, কোন ভদ্র ছেলের ব্যাটা তাকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে।
মন্টারাম ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। বোম্বাইতে তার বিরাট কারবার। এহেন মন্টার সাথে তার মেয়ের বিয়ের কথা হতে পারে মিলির বাপ স্বপ্নেও ভাবেনি। কুসুম মাসি মিলির মায়ের লতায় পাতায় বোন। সম্বন্ধটা কুসুম মাসিই এনে দিয়েছিল। ভিতরে ভিতরে তখন অনেকেরই খুব হিংসে। একদিনতো মোড়ল বলেই দিল মিলির বাপকে,
“ভাগ্যলক্ষী লটারি মারি দিলি রে রাখাল।”
বিয়েটা অবশ্য একটু রাখঢাক করেই করতে হয়েছে। আঠারো বছর বয়স না হলে আজকাল গাঁয়ের দিকেও বিয়ে দেওয়া খুব মুশকিল। একবার খবর হয়ে গেলেই, এস.ডি. সাহেব দলবল নিয়ে ভাঙচি দিতে চলে আসবে।
মিলি আগে কখনো দূরপাল্লার ট্রেনে চাপেনি। বোম্বাই তো দূরের কথা, শহর বলতে মিলি বোঝে মালদা। বাপের বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার চিনচিনে ব্যথাটা আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। মিলির মনের মধ্যে তখন একটা অদ্ভুত আনন্দের ঢেউ। নতুন জীবন, নতুন শহর। অবশ্য একটু ভয় ভয় যে করছে না তা নয়।বম্বেতে নাকি রাস্তাঘাটে সিনেমা আর্টিস্টরা ঘুরে বেড়ায়। আর লোকে নাকি কথায় কথায় ইংরেজি বলে।
অন্ধকার একটা ঘর। মিলি ভালো করে আশপাশটা দেখার চেষ্টা করে। কিসের একটা বিচ্ছিরি গন্ধ। ওর মাথাটাও খুব ভারী হয়ে আছে। ওর মনে পড়ে যায়, ও ট্রেনে করে বোম্বাই যাচ্ছিল ওর স্বামী মন্টারামের সঙ্গে। আস্তে আস্তে যখন অন্ধকারের চোখটা একটু সয়ে এসেছে একটা অজানা আতঙ্কের ঢেউ নেমে যায় মিলির শিরদাঁড়া দিয়ে। পাশেই কেউ গোঙাচ্ছে। মেঝেয় পড়ে আছে ওরই বয়সই আর একটা মেয়ে। সম্পূর্ণ বিবস্ত্র।
বাংলায় একটা কথা আছে, রাখে হরি মারে কে। সব পাচারের গল্পেই যে অকথ্য যৌন নির্যাতন থাকবে তার কোন মানে নেই। ওপরওয়ালা চাইলে উত্তরপ্রদেশের যৌন পল্লীতে পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েও নরক যন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচে যায় কেবলমাত্র ভাগ্যের জোরে। উত্তর প্রদেশ পুলিশের একটা স্পেশাল টিম অনেকদিন ধরেই একটা পাচার চক্রকে ধরার চেষ্টা চালাচ্ছিল। সেই রাতের স্পেশাল অপারেশনে যে কজন মেয়েকে উদ্ধার করা হয় তার মধ্যে মিলি একজন। তারপর দু-একটা আরো সরকারি হোম ঘুরে শেষমেষ মিলি পৌঁছেছে কলকাতার এই হোমে। আজ প্রায় তিন মাস হল। খবর গেছে মিলির বাড়িতেও। কোর্ট থেকে অর্ডারও হয়ে গেছে। মিলির বাবা এসে নিয়ে যাবে মিলিকে।
এইমাত্র একটা মেয়ে এসে বলে গেল, “এই মিলি। তোকে দিদিমণি ডাকছে। তাড়াতাড়ি অফিস ঘরে যা। মনে হয় তোর বাবা এসেছে তোকে নিতে।”
মিলি একছুটে অফিস ঘরে চলে যায়। বেঞ্চের উপর অপরাধীর মতন মুখ করে লোকটা বসে আছে। ভাগ্য লক্ষ্মী লটারি মেরে ফুলে ওঠা বুকটা যেন একটু চুপসে গেছে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশ কাকুটা মিলির দিকে ইঙ্গিত করে ওর বাবাকে বলে, “ওই যে তোর মেয়ে।”
বাবা আর মেয়ে দুজনেই দুজনের দিকে হতভম্বের মতন তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর নিস্তব্ধতা ভেঙে ওর বাবা বলে ওঠে, “ইটো আমার মেয়ে নয় বাবু।”
পুলিশ কাকু ঝাঁঝিয়ে ওঠে, “তোর মেয়ে নয় মানে! চ্যাংড়ামো হচ্ছে। একদম নাটক করবি না।”
“মা কালীর দিব্যি বাবু, মিছে কথা নয়।……”
গলার কাছে দলা পকানো জিনিসটাকে মিলি কিছুতেই বাগে আনতে পারে না। কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে বলে ওঠে, এটা জেলখানা নয়, এটা হোম।