এই গল্পটা সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। একটা কথা মাথায় রাখবেন, সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত গল্প আর সত্য ঘটনা কিন্তু একই জিনিস নয়। এটি সত্যের উপর ভিত্তি করে রচিত কল্পকাহিনী। তবে গল্পের ঘটনাক্রমে রুল-অফ-এথিকস মেনে অনেকটাই অদল-বদল ঘটাতে হয়েছে। যাতে আসল চরিত্রদের গোপনীয়তা লঙ্ঘন না হয়। এই গল্পের, স্থান, কাল, পাত্র এবং ঘটনা ক্রম সম্পূর্ণ কাল্পনিক। যদি কোন পাঠক এই গল্পের স্থান কাল পাত্র এবং ঘটনাক্রমের সঙ্গে বাস্তব জীবনের কোন ঘটনার মিল খুঁজে পান, তাহলে বুঝবেন ওইটুকু মিল কিন্তু কাকতালীয়। শুরু করছি, আজকের গল্প, “ডিভোর্স”।
সরকার বাবু বিরাট নামকরা বাঘা উকিল না হলেও, ঈশ্বরের কৃপায় মক্কেলের আগমন লেগেই থাকে। এলাকায় সরকার উকিল নামে সকলেই এক ডাকে চেনে। তবে সালিশি বাবু হবার পরে, ইদানিং পসার একটু বেড়েছে। গত বছর থেকে উনি মহামান্য উচ্চ আদালতের এম্পানেলড ট্রেইন্ড মিডিয়েটর হয়েছেন। গা-গঞ্জের লোকেরা বলে সালিশি বাবু। কোন বিচারাধীন মামলায় জজ সাহেবের যদি মনে হয় দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে আপসে মিটমাট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তখন জজ সাহেব হুকুম করেন দুই পক্ষকে তার সামনে উপস্থিত হওয়ার জন্য। বেশিরভাগই অবশ্য মিটমাট হয় না। কিছু কিছু কেস তো মিটে যাব যাব করেও মেটেনা। যেমন এই কেসটা। ডিভোর্সের মামলা।
এমনিতে সালিশির অনেক নিয়ম আছে। মিডিয়েটর সমস্যার সমাধান বলবেনা। মিডিয়েটর শুধু দু’পক্ষকে সমাধানের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে। আলোচনায় উৎসাহিত করবে। তারপরে আলোচনার মাধ্যমে দু’পক্ষকে খেলিয়ে খেলিয়ে সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে হবে। থিওরিটা খুবই গোলমেলে। মানে ঠিক গোলমেলে নয়। গণ্যমান্য পন্ডিত মানুষদের বানানো থিওরি, হেলাফেলার ব্যাপার তো অবশ্যই নয়। তবে কোর্টকাছারিতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া লড়াকু বাদী বিবাদী পক্ষকে থিওরি মেনে সমস্যার সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া যে প্রায় অসম্ভব, সেটা সরকার বাবু শুরুতেই বুঝে গেছেন। তাই সরকার বাবু নিজের মতন করে একটা সিস্টেম বানিয়েছেন। উনি প্রথমে বাদীপক্ষকে ডাকেন। বাদী পক্ষের বক্তব্য শোনার পরে, বিবাদী পক্ষের বক্তব্য শোনেন। দু পক্ষের বক্তব্য আলাদা আলাদাভাবে শুনে নেবার পর, দুই পক্ষকে সামনাসামনি আলোচনায় বসান।
ভদ্রমহিলা, মানে বাদীর বয়স তিরিশের কাছাকাছি। সাত বছরের বিবাহিত জীবন। স্কুল টিচার। একটি ছেলেও আছে। দু’পক্ষের মধ্যে অন্য কোনো মামলা মোকদ্দমা নেই। ভদ্রমহিলা নিজে স্কুল টিচার। ওনার দাবি ডিভোর্স আর সঙ্গে ছেলের কাস্টডি।
সরকার বাবু বললেন, “বেশতো ডিভোর্স না হয় হবে। কিন্তু মহামান্য আদালত যখন নির্দেশ দিয়েছে একবার আলোচনা করে দেখতে, দেখাই যাক না একবার আলোচনা করে।”
সরকার বাবুকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ভদ্রমহিলা ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, “কিছুই আলোচনা করার নেই। একটা ছোটলোক। ওরকম ছোট লোকের সঙ্গে আমি আর এক মুহূর্তও ঘর করব না।”
চেম্বারের বাইরে ভদ্রলোক সোফায় বসে আছেন। পেশায় অধ্যাপক। সরকার বাবু চশমার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে এক ঝলক দেখে নিলেন। দেখে অবশ্য সাদামাটা নিপাট ভদ্রলোক বলেই মনে হচ্ছে।
সরকার বাবু বললেন,
“আপনার স্বামী কলেজের অধ্যাপক না?”
“তো? কলেজের অধ্যাপক ছোট লোক হতে পারে না? অধ্যাপক বলে কি সে আইনের ঊর্ধ্বে?”
“না না, তা কেন হতে পারে না। হতেই পারে। যে কেউ ছোটলোক হতে পারে। জজ, ব্যারিস্টার, ডাক্তার, প্রফেসার, স্কুল টিচার….”
বলেই ভদ্রমহিলার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে সরকার বাবু নিজেকে সামলে নিলেন,
“ইয়ে, মানে স্কুল টিচার বাদে, যে কেউ ছোটলোক হতে পারে। একমাত্র স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা এনারা মানুষ গড়ার কাজ করেন। স্কুল টিচার, কিছুতেই ছোটলোক হতে পারে না।”
অবশ্য সরকার বাবুর ডায়লগে ভদ্রমহিলার চোখে-মুখে কোন ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেল না।
“দেখুন মহামান্য আদালত যখন নির্দেশ দিয়েছেন, তখন আমাদের একবার আলোচনা করতেই হবে। আলোচনা মানেই যে মিটমাট করতেই হবে, আপস করতেই হবে, তা তো নয়।”
“এতে আলোচনা করার কি আছে। যে আমার বাবাকে অপমান করতে পারে, তার সাথে আমি থাকবো না। আমার বাবার অপমান আমি সহ্য করবো না।”
সরকার বাবু সহানুভূতির সুরে বললেন, “ঘোর অন্যায়। ঘটনাটা যদি একটু বিস্তারিত বলেন।”
“এক ঘরভর্তি লোকের সামনে আমার বাবার নামে যা নয় তাই বলেছে। নোংরা নোংরা কথা। সেসব কথা মুখে আনাও পাপ। আপনার যদি ডিটেইলসে জানতে হয়, ওকে জিজ্ঞাসা করুন।”
সরকার বাবু অনেক চেষ্টা করেও ভদ্র মহিলার মুখ থেকে এর বেশি কিছু বার করতে পারলেন না।
সুতরাং স্বামীর ডাক পড়লো চেম্বারের ভিতরে। লোকটা শিক্ষিত। কথাবার্তা যথেষ্ট সুন্দর। অমায়িক ব্যবহার। সরকার বাবু কোনরকম ভনিতা না করে বললেন, “আরে মশাই করেছেন কি! এক ঘর ভর্তি লোকের সামনে শ্বশুরমশাই কে অপমান করেছেন?”
“তাই বলেছে বুঝি?”, ভদ্রলোক একটু নিচু গলায় বললেন।
“হুম্!”
ভদ্রলোক গলাটা আরো একটু নামিয়ে বললেন,
“বাজে কথা। আসলে সত্যি কথাটা নিতে পারেনি। নিজের বাপের কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি নিজে মুখে কি আপনাকে বলবে?”
সরকার বাবু বললেন, “বলেন কি? কেচ্ছা-কেলেঙ্কারি মানে?”
“তাহলে আর বলছি কি। এই অধমের একমাত্র অপরাধ হলো, আমি আমার শ্বশুরের পরকীয়া সম্পর্ক হাতেনাতে ধরে ফেলেছি। একদম রেড হ্যান্ড।”
সরকার বাবু চোখ কপালে তুলে বললেন, “বলেন কি?”
“তবে আর বলছি কি! কখনো কখনো তো থ্রিসাম ফোরসামও চলে। আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
সরকার বাবু পকেট থেকে রুমাল বার করে কপাল থেকে ঘাম মুছে নিলেন। মনে মনে ভাবলেন, সমাজটা কোথায় যাচ্ছে। মেয়ের বাবা অভিযোগ করছে জামাই লম্পট, এ জিনিস সচরাচর ঘটেই থাকে। কিন্তু জামাই বাবাজি লম্পট শ্বশুর মশাই কে রেড হ্যান্ড কট করছে, এমন অভিজ্ঞতা ওনার এই প্রথম। জটিল কেস। সহজে মিটবার নয়।
টেবিলের ওপারে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে স্বামী-স্ত্রী কে বসিয়ে সরকার বাবু গলা খাকারি দিয়ে ওপেনিং স্টেটমেন্ট শুরু করলেন। গত এক বছরের অভিজ্ঞতায় সরকার বাবু বুঝেছেন, এই ওপেনিং স্টেটমেন্ট টাই হলো মিডিয়েসনের তুরুপের তাস। বাদী বিবাদী দু’পক্ষেরই বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। দু’পক্ষকেই আশ্বস্ত করতে হবে যে আমি ঝোলেও নেই অম্বলেও নেই। মানে আমি নিরপেক্ষ। তারপর দু’পক্ষের সামনে তাদের আসল বিবাদের জায়গাগুলো তুলে ধরতে হবে। তারপর শুরু হবে সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা। সরকার বাবু মনে মনে ইস্ট দেবতার নাম জপ করে শুরু করলেন;
“দেখুন প্রত্যেকটা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সমাজ দর্শন আলাদা। আপনাদের স্বামী স্ত্রীর মধ্যে যে ঘটনা নিয়ে বিবাদ, সে ঘটনাকে আপনারা দুজনেই নিজের নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করেছেন। আপনাদের দু’পক্ষের মুখ থেকে শোনা ঘটনার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করে আমি যা বুঝলাম; আপনারা যে বিষয় নিয়ে লড়াই করছেন, সে বিষয়টা আপনাদের বিষয়ই নয়। আপনার বাবা, আর আপনার শ্বশুর মশাই, ওনার যদি অন্য কোন মহিলার সঙ্গে সম্পর্ক থেকেও থাকে, সেটা ওনার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। আপনারা বোকার মতন…..”
সরকার বাবু কথা শেষ করার আগেই, ভদ্রমহিলা হাউমাউ করে উঠলেন, “মুখ সামলে কথা বলুন। তখন থেকে মহামান্য আদালতের নির্দেশ, মহামান্য আদালতের নির্দেশ, বলে যাচ্ছেন। মহামান্য আদালত কি আপনাকে এই শয়তানটার সঙ্গে মিলে আমার স্বর্গগত বাবার নামে কুৎসা করতে নির্দেশ দিয়েছেন?”
সরকার বাবু মনে মনে প্রমাদ গুনলেন। মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। ভদ্রমহিলার বাবাটি যে স্বর্গগত, সেই ইনফরমেশনটা মিস হয়ে গেছে। আসলে মানুষ একবার দেহত্যাগ করলে, পড়ে থাকে শুধু আত্মা। আর আত্মা জিনিসটার সঙ্গে আবার পরমাত্মার ডাইরেক্ট কানেকশন। সুতরাং কোনো মানুষ জীবিত কালে যতই লম্পট হোক না কেন, একবার দেহত্যাগ করতে পারলেই ব্যাস। ঈঁশ্বর। স্বর্গগত মানুষের সম্পর্কে কথা বলতে গেলে তাই একটু সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। একজন ব্যবহারজীবী হিসেবে তার অন্তত এই বিষয়টা খেয়াল রাখা উচিত ছিল। উনি ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমি অত্যন্ত দুঃখিত! আপনার বাবা যে মারা গেছেন, সে বিষয়ে আমি একেবারেই ওয়াকিবহাল ছিলাম না।”
তারপর ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই! এতকিছু বললেন অথচ এটা বললেন না যে আপনার শ্বশুর মশাই মারা গেছেন!”
ভদ্রলোক মিনমিন করে কি একটা বলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার আগেই ভদ্রমহিলা তেড়ে-ফুঁড়ে বলে উঠলেন, “এত কিছু মানে? এত কিছু মানে কি? ঠিক কি কি বলেছে, ওই শয়তানটা আমার বাবার নামে?”
সরকার বাবু ততক্ষণে বুঝে গেছেন। মহিলা বড্ড জাদরেল। একে কিছু বোঝানো প্রায় অসম্ভব। তবে এলাকায় সরকার উকিল নামে লোকে ওনাকে এক ডাকে চেনে। অনেকে আবার ভুল করে বলে সরকারি উকিল। তাতে অবশ্য মান একটু বাড়ে বই কমেনা। অন্য কোন মক্কেলের যদি চোখে পড়ে যায়, যে দোর্দণ্ডপ্রতাপ সরকার উকিল বসে বসে এক ভদ্রমহিলার মুখঝামটা খাচ্ছে তাহলে আর লোক সমাজে মুখ দেখানো যাবেনা। তাই চোখে মুখে একটা বিরক্তির ভাব ফুটিয়ে, ভুরু দুটো যতটা সম্ভব কুঁচকে, ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখুন আপনার স্বামী শয়তান কিনা, কিংবা শয়তান হলেও ঠিক কতটা শয়তান, সেটা বিচার করার জন্য আমাকে এখানে বসানো হয়নি। আপনার অভিযোগ আপনার স্বামী আপনার বাবাকে সকলের সামনে অপমান করেছে। আর অন্যদিকে আপনার স্বামীর দাবি, উনি আপনার বাবার পরকীয়া সম্পর্ক হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন। হতেই পারে।”
সরকার বাবু হয়তো আরো কিছু বলতেন। কিন্তু ভদ্র মহিলা তার আগেই স্বভঙ্গিমায় বলে উঠলেন, “আজ্ঞে না। হতে পারে না। আমার বাবা একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ছিলেন। ঠাকুর পূজো না করে কোনদিনও অন্নজল স্পর্শ করতেন না।”
ওদিকে বর বাবাজিও কোমর বেঁধে ঝগড়া করতে লেগেছে।
“এএএএএহ্! নিষ্ঠাবান না ছাই। আমি নিজের চোখে দেখেছি।”
“কি? কি দেখেছিস তুই? অসভ্য জানোয়ার একটা। লজ্জা করে না একটা মরা মানুষের ব্যাপারে উল্টোপাল্টা কথা বলতে? তোর নরকেও ঠাঁই হবে না।”
সরকার বাবু দেখলেন, ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তার সাধের চেম্বার অলরেডি মাছ বাজারে পরিণত হয়েছে। তাই আর উপায় না দেখে দু’পক্ষকেই ধমকে উঠলেন।
“চুপ। একদম চুপ। যথেষ্ট সহ্য করেছি, আর নয়। এবার আমি যা জিজ্ঞেস করব তার বাইরে কেউ কোন কথা বলবে না।”
ধমকে কাজ হয়েছে। সরকার বাবু ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে বললেন, “এবারে খোলসা করে বলুন তো! ঠিক কবে, কিভাবে, আপনার বাবাকে উনি অপমান করেছেন।”
ভদ্রমহিলা এবার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। সরকার বাবু আবার মেয়েদের কান্না একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। সেই ভয়ে উনি নিজে বিয়ে পর্যন্ত করেননি। তাই যতটা সম্ভব সহানুভূতির স্বরে বললেন, “আহা! এতে কান্নাকাটির কি হলো? সমস্যা যখন আইন আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, তখন ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে একটু কাটাছেঁড়া তো হবেই।”
ভদ্রমহিলা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলতে শুরু করলেন,
“আমার বাবার শ্রাদ্ধের দিন দুপুর বেলা, ঘরভর্তি আত্মীয়-স্বজন, পাড়ার লোকজন। সবার সামনে, এই অসভ্য লোকটা, বলে কিনা, তোমরা এখানে সবাই অপেক্ষা করছো, আর ওদিকে তোমার বাবা ছাদে ইনটু পিনটু করছে। আমি বললাম, এসব কি যা তা বলছ! ইনটু পিনটু করছে মানে? এক ঘরভর্তি লোকের সামনে আমাকে বলে কিনা, ইনটু পিনটু বোঝনা? গিয়ে দেখে এসো অন্য মহিলা নিয়ে ফুর্তি করছে………” এতটা বলে ভদ্রমহিলা আরো ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন।
সরকার বাবু অবাক হয়ে বললেন, “দাঁড়ান দাঁড়ান! সব কেমন ঘেঁটে যাচ্ছে। শ্রাদ্ধের দিন মানে? আপনার বাবার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান?”
ভদ্রমহিলা কাঁদতে কাঁদতেই মাথা নেড়ে বললেন, “হ্যাঁ”
সরকার বাবু গম্ভীর হয়ে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ব্যাপারটা কি? একটু ঝেড়ে কাশুন তো মশাই।”
ভদ্রলোক বললেন, “তাহলে শুরু থেকেই বলি। আমি জন্মদোষে জাতে ব্রাহ্মণ। তবে ভগবানে আমার বিশ্বাস ও নেই অবিশ্বাস ও নেই। অবশ্য অন্যের সেন্টিমেন্টে আঘাত করার আমার কোন ইচ্ছে কোন কালেই ছিলনা। আমি মশাই ওরকম মানুষই নই। শ্বশুরমশাই এর শ্রাদ্ধের দিন, পায়জামা পাঞ্জাবী পড়ে, সকাল থেকে শুকনো মুখে, কখনো রান্নার তদারকি করছি, তো কখনো গোবর আনতে যাচ্ছি। সেই কোন সক্কালে উঠেছি। দুপুর বারোটার মধ্যে, নিমন্ত্রিতরা সব এসে গেছে। টেবিল ফুল। জল আর কলা পাতা দেওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু খেতে দেওয়া যাচ্ছে না। শুনলাম এক থালা খাবার ছাদে রেখে আসা হয়েছে। আমার স্বর্গগত শশুর মশাই, তিনি নাকি একটি কাকের রূপ ধারণ করে, আসবেন, ওনার প্রিয় প্রিয় সব খাবার উনি খাবেন। আর তারপরে ওনার ভোজন শেষ হলে, তবে বাকি সকলে দুটি অন্নজল মুখে দিতে পারবে। যথারীতি দায়িত্ব আমার ওপরে পড়ল পাঁচতলার ছাদে গিয়ে দেখে আসতে হবে। কাকরূপী শ্বশুরমশাইয়ের মধ্যাহ্নভোজন সম্পন্ন হল কিনা। মশাই ছাদে গিয়ে বসে আছি তো বসেই আছি। প্রায় ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করানোর পরে তবে তিনি এলেন। সাক্ষাৎ শ্বশুরমশাই। অন্য কোন সাধারণ কাক নয়। চোখের চাহনি দেখেই বুঝেছি। যতই আমি বিজ্ঞান পড়া নাস্তিক হই না কেন, চোখের সামনে কাকরূপী শ্বশুর মশাই কে দেখেই আমার তখন একটু শুকিয়ে গেছিল। উনি এসে প্রথমে ছাদের পাঁচিলের ওপর বসলেন। তারপর থালার দিকে তাকিয়ে যখন দেখলেন সবই ওনার প্রিয় প্রিয় খাবার, তখন মনে হয় একটু প্রসন্ন হলেন। আমার তো এদিকে খিদের চোটে বেহাল অবস্থা। অপেক্ষা করে করে হেঁদিয়ে গেছি। এখন শ্বশুর মশাই দুটি অন্ন মুখে তুললে, আমারও একটা হিল্লে হয়। উনি উড়ে এসে থালার সামনে বসলেন। আমি তো রেডি। একটা ঠোক্কর মারবে, আর আমি দৌড়ে গিয়ে খুশির খবরটা দেব। অমনি কোথা থেকে দুটো সুন্দরী কাকিনী যেই না উড়ে এসে ছাদের পাঁচিলে বসেছে। শ্বশুরমশাই খাবার ফেলে ল্যাং ল্যাং করে করে তাদের পেছনে চলে গেলেন। ওদিকে আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সদ্য বিধবা শাশুড়ি, সবাই অভুক্ত। অপেক্ষা করছে কখন উনি খাবেন। খাবে কি মশাই, খাবারের দিকে তার তখন নজর কোথায়। একবার একটাকে নিয়ে ছাদের পূর্ব দিকের কোনায় যায়, তো আরেকবার ছাদের অন্য কোনায় গিয়ে আরেকটার সাথে ইনটু পিনটু করে। তাও আমি আধঘণ্টা সহ্য করেছি। ভাবলাম সদ্য মুক্তি পেয়েছেন, একটু তো মনটা ছোঁক ছোঁক করবেই। তারপর যখন বুঝলাম যে খাবারের প্রতি ওনার আর কোন আসক্তিই নেই, আমি নিচে গিয়ে শুধু বললুম, শশুর মশাই এখন ব্যস্ত। উনি খাবেন না। তোমরা সবাই খেতে শুরু করো। মা কালীর দিব্যি, এর বাইরে আমি কোনো কথাই বলিনি। কিন্তু আমাকে আর কে পাত্তা দেয়। নানা রকম প্রশ্ন। কি দেখেছি ছাদে গিয়ে। কি করে বুঝলাম শ্বশুরমশাই ব্যস্ত। আমি সাদামাটা মানুষ। সবাই মিলে ওরকম পুলিশি জেরা করলে ঘাবড়ে যাব না! স্বাভাবিকভাবেই ঘাবড়ে গিয়ে আমি বলেছিলাম, যে শ্বশুরমশাই ছাদে খাবার ফেলে অন্য মহিলার সঙ্গে ফুর্তি করতে ব্যস্ত। আপনি বলুন কি এমন অন্যায় করেছি?”
নাহ্! সরকার বাবু আর ন্যায় অন্যায়ের বিচার করার রিক্স নেননি। শোনা যায় তিনি নাকি তারপর থেকে আর সালিশি করার দায়িত্ব নেন না।
Copyright © Jewel Chanda